শ্রীতারকচন্দ্র রায় রচিত পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসের দ্বিতীয় খণ্ডের ব্যাপ্তি ছিলো বেকন থেকে হেগেল পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে হেগেলের মৃত্যুর পর দার্শনিক চিন্তাধারা এত বিভিন্ন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাতে প্রবাহিত হয়েছে যে, এই যুগের, অর্থাৎ হেগেল পরবর্তী যুগের ইতিবৃত্তকে একটি স্বতন্ত্র পর্বে বিভাজিত না করে কোনো উপায় নেই। হেগেল পরবর্তী দার্শনিক ইতিবৃত্তের এই পরবর্তী যুগই 'সমসাময়িক' বা 'সমকালীন' যুগ নামে দার্শনিক মহলে মান্যতা পেয়েছে। প্রকৃতকল্পে, হেগেলের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর অনুসারী ও অনুগামীরা কিছু জটিল বিষয় নিয়ে ডানপন্থী হেগেল ও বামপন্থী হেগেল, এই দুই যুযুধান দলে বিভাজিত হয়ে পড়েন। ঈশ্বর, আত্মার অমরত্ব এবং পরকাল বা মৃত্যু পরবর্তী জীবন প্রভৃতি যেসব বিষয় নিয়ে। হেগেল সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি, বা যেসব বিষয়ে বলার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি, মূলত সেসব বিষয় নিয়েই হেগেলের অনুসারী ও অনুগামীদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্তভাবে বিতর্কের মহাপ্লাবন বয়ে যায়। যাঁরা হেগেলের ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন মূলত রক্ষণশীল। আর এ কারণেই তাঁরা হেগেলীয় দর্শনের অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক দিকটির 'ওপর আদ্যতা দেন। কিন্তু অপেক্ষাকৃত নবীন বামপন্থী হেগেলীয়ানরা ছিলেন স্বভাবতই উদারভাবাপন্ন। তাই তাঁরা নতুন অর্থনৈতিক, 'রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থার আলোকে হেগেলের দার্শনিক মতবাদকে ব্যাখ্যা করার ওপর আদ্যতা দেন। তাই তাঁরা হেগেলীয় দর্শনের রক্ষণশীল দিকটি পরিহার করে কেবল বৈপ্লবিক দ্বান্দ্বিক দিকটি নিয়ে দর্শনভাবনায় উদ্বুদ্ধ হন। কালক্রমে বামপন্থী হেগেলীয়ানরা হেগেলের রক্ষণশীল ভাববাদী মতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দার্শনিক আন্দোলনও গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে দৃষ্টবাদ, নব্য হেগেলীয়বাদ, বিবর্তনবাদ, প্রয়োজনবাদ, বাস্তববাদ, নব্য-বাস্তববাদ, মার্কসবাদ, রূপতত্ত্ব, অস্তিত্ববাদ, যৌক্তিক দৃষ্টবাদ ও বিশ্লেষণী দর্শন অন্যতম। এর মধ্যে যৌক্তিক দৃষ্টবাদের অধিবিদ্যা বা পরাতত্ত্ব বিরোধী আন্দোলন নানা কারণে সমকালীন প্রতীচ্য দর্শনের ইতিবৃত্তে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শ্রীতারকচন্দ্র রায় প্রস্তাবিত তৃতীয় খণ্ডে যৌক্তিক দৃষ্টবাদী আন্দোলনসহ উল্লিখিত প্রতিটি দার্শনিক প্রস্থান নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন।