এই পাইন গাছের আলোয়-ছায়ায় ঘুরে ঘুরেই কেটে গেল সারাটা দিন৷ কেটে গেল পাখির ডাক শুনে আর দূরের শিবালিক পাহাড় দেখে।
বেশ লাগল। অনেক দিন পর মনটা সত্যি খুশিতে ভরে গেল। বেশ হালকা মনে হলো নিজেকে।
এই পৃথিবী বড় বিচিত্র। তিন ভাগ জল থাকা সত্ত্বেও বড় নিষ্ঠুর। বড় নির্মম। সব কিছু থেকেও কোথায় যেন একটু ফাঁক থেকে গেছে। সেই অদৃশ্য অজ্ঞাত ছিদ্র দিয়েই মানুষকে হারাতে হয় কত কিছু। মাঝে মাঝে ভাল লাগলেও সুর কেটে যায় বড় বেশি। রঙিন বসন্তের পাশে-পাশেই শীতের জড়তা।
আজ কিন্তু বেশ লাগছে। গণ্ডীবদ্ধ সংসারের বাইরে উদার সবুজ প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেশ লাগছে। এই মৌন প্রকৃতি যেন সিদ্ধপুরুষ। সর্বত্যাগী মহাসন্ন্যাসী। সুখ-দুঃখ ভাল-মন্দের জোয়ার-ভাঁটা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। একটা মিষ্টি পরিতৃপ্তিতে আমার মনটা ভরে গেল।
বোটানিক্সের পাশ দিয়ে ঘুরতে বেশ লাগছিল। একটা কাঠবেড়ালী সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ। একেবারে আমার মুখোমুখি। হয়ত আগন্তুক দেখে খবর নিতে এসেছে। একবার যেন হাসল। লেজ নাড়তে নাড়তে হাসল। বিদ্রূপের হাসি নাকি ? ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমিও হাসলাম। ব্যস! কাঠবেড়ালীটা সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালাল বনের মধ্যে।
আমি বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়েই রইলাম। অপলক দৃষ্টিতে ওর পথের দিকে চেয়ে রইলাম। ছোট্ট একটা জীব। কতটুকুই বা ওর প্রাণ! তবু কত প্রাণচঞ্চল। কত হাসিখুশি। বিদ্যা-বুদ্ধি বিবেচনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কি অত প্রাণচঞ্চল হতে পারি ? অত সহজ সরল ?
আশপাশের গাছপালা আর ঐ দূরের শিবালিক আরো ভাল লাগল। ভাল লাগল নিজেকেও। পর পর কয়েকবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে সারা বুকটা ভরিয়ে নিলাম।
কাঠবেড়ালীটার পথ চেয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। হয়ত কয়েক মিনিট, হয়ত আরো বেশি। পেছন থেকে গাড়ির হর্ন শুনে সরে দাঁড়ালাম। গাড়িটা চলে গেল। আমিও হাঁটতে শুরু করলাম।
বোটানিক্স পেছনে ফেলে এলাম বিরাট সবুজ মাঠের মাঝে। দূরে এফ আর- আই-এর মেন বিল্ডিং। পাষাণে গাঁথা অত বড় বিল্ডিংটাকেও খারাপ লাগল না।
বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক নিমাই ভট্টাচার্য ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি নিবাস তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার (বর্তমান জেলা) শালিখা থানার অন্তর্গত শরশুনা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। নিমাই ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বগুড়া জেলার কালীতলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কন্যা দীপ্তি ভট্টাচার্যকে বিবাহ করেন। কলকাতার টালিগঞ্জের শাশমল রোডের বাসায় বসবাস করতেন তিনি। শিক্ষাজীবন: নির্মম অদৃষ্ট সাড়ে তিন বছর বয়সে তিনি মাতৃহীন হন। পিতার সীমিত আয়ে অকল্পনীয় দুঃখ কষ্ট অভাব অভিযোগের মধ্যে ভর্তি হলেন কলকাতা কর্পোরেশন ফ্রি স্কুলে। কলকাতা রিপন স্কুলে কিছুদিন তিনি পড়াশুনা করার পর যশোরে ফিরে আসেন। ১৯৪১ সালে যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে চতুর্থ শেণীতে ভর্তি হন এবং নবম শ্রেণী পর্যন্ত সেখানে পড়াশুনা করেন। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ বাবুও এক সময় সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ও পরবর্তীতে শিক্ষক ছিলেন। দেশ বিভাগের পর নিমাই ভট্টাচার্য পিতার সঙ্গে কলকাতায় চলে যান এবং পুনরায় কলকাতায় রিপন স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হন এবং রিপন কলেজ থেকে আই. এ পাশ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫২ সালে তিনি বি. এ পাশ করেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু প্রথম অবস্থায় সেখানেও তিনি ভাগ্যের বিড়ম্বনার স্বীকার হন। নিমাই ভট্টাচার্যের সাহিত্য চিন্তা তাঁর জীবনচর্চার একান্ত অনুগামী হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে তাঁর লেখা একটি উপন্যাস কলকাতার সাপ্তাহিক ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং সাহিত্যামোদীদের নিকট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। পরবর্তীকালে ‘রাজধানী নৈপথ্য’ রিপোর্টার. ভি. আই. পি এবং পার্লামেন্ট স্টীট নামক চারখানি উপন্যাস ঐ একই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিমাই ভট্টাচার্য পূর্ণোদ্যমে আরো আরো উপন্যাস লেখা শুরু করেন। ‘মেমসাহেব’, ‘ডিপেস্নাম্যাট’, ‘মিনিবাস’, ‘মাতাল’, ‘ইনকিলাব’, ‘ব্যাচেলার’, ‘ইমনক্যলাণ’, ‘ডিফেন্স’, ‘কলোনী’, ‘প্রবেশ নিষেধ’, ‘কেরানী’, ‘ভায়া ডালহৌসী’, ‘হকার্স কর্নার’, ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘নাচনী’, ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’, ‘ডার্লিং’, ‘ম্যাডাম’, ‘ওয়ান আপ-টু-ডাউন’, ‘গোধুলিয়া’, ‘প্রিয়বরেষু’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘মোগল সরাই জংশন’, ‘ইওর অনার’, ‘ককটেল’, ‘অনুরোধের আসর’, ‘যৌবন নিকুঞ্জে’, ‘শেষ পরানির কড়ি’, ‘হরেকৃষ্ণ জুয়েলার্স’, ‘পথের শেষে’ প্রভৃতি প্রকাশিত উপন্যাসগুলি উল্লেখযোগ্য। নিমাই ভট্টাচার্যের লেখা উপন্যাসগুলোতে বিষয়গত বৈচিত্র্যতার ছাপ প্রস্ফূটিত হয়ে উঠেছে।