এইমাত্র দশটা বাজলো। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মনে হয় না সারাবেলাতেও আর রোদ উঠবে। দু'তিনদিন ধরেই এই চলছে। অথচ এটা বর্ষাকাল নয়। ফাল্গুন মাস। বসন্তকাল। শীত এখনো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি আবহাওয়া থেকে, মেঘলা দিন হয়ে আরো শিরশিরানি বেড়েছে। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে উর্মিলা জানালার ধার থেকে উঠে পিছন দিককার ঢাকা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বেশ কিছুক্ষণ আগে সত্যেন তার কাজে চলে গেছে। আগে ভাত খেয়ে বেরুতো, এখন অত্যন্ত তাড়াতাড়ি যায় বলে ব্রেকফাস্টেই দুপুরের খাওয়াটা সমাধা করে নেয়। তাও যে খুব একটা ভারি কিছু খেয়ে যায় তা-ও নয়, যেমন আগে খেতো তার চেয়ে সামান্য দেরিতে সামান্য বেশি। ভোজ্যদ্রব্যের তালিকায় একটা ডিম থাকে এই পর্যন্ত। উর্মিলার খারাপ লাগে। লজ্জা করে। কিন্তু সত্যেনের এখন এই নিয়ম। তার মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই ভাত খাওয়ার পাটটা সে বাদ দিয়েছে।
অথচ আগের মতোই নিয়মিত বাজারে যায়, ভালো মাছ আনে, টাটকা সবজি আনে, ফল আনে, কো-অপারেটিভ থেকে দুধ আনে, শুধু নিজে খায় না। আগে মা-ই রান্না করতেন। একজন ঠিকের বৌ আছে। খুব লক্ষ্মী, খুব ভালো। ভোর ছ'টা থেকে ন'টার মধ্যে সমস্ত কাজ সেরে দিয়ে যেতো সে। ঘর ঝাঁট দেয়া, মোছা, উনুন ধরানো, কয়লা ভাঙা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, জল ধরা, মশলা করা, মাছ কোটা কিছুই সে বাকি রেখে যেতো না। তারপরের টুকটাক কাজ যেমন, ঘর গুছোনো, বিছানা ঢাকা অথবা পাতা, কাপড় কুচোনো, ইত্যাদি যা কাজ পড়ে থাকতো সেগুলো উর্মিলা করে নেয়, মা রান্না করেন। মানে করতেন । আপাতত উর্মিলা করছে। সত্যেনের সেটা মত নয়। কিন্তু উর্মিলার জেদে দু-দুবার রান্নার লোক এনেও তাকে বাতিল করতে হয়েছে।
উর্মিলা এ নিয়ে বচসা করে না, ঝগড়া করে না, সরবে কিছু বলে না, লোক এলে নিঃশব্দ থাকে, কিন্তু সত্যেন তাকে বহাল করে কাজে বেরুতে না বেরুতেই মিষ্টি কথায় বাতিল ক’রে দেয়। হয়তো তারই পরিণতি এই, ভাত না খেয়ে কাজে যাওয়া।
সত্যেন এখান থেকে হাওড়া ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। একটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনার কাজ করে সে। ট্রেনে হাওড়া যেতে মাত্রই লাগে ছাব্বিশ মিনিট, কিন্তু আগে পরে যেটুকু রাস্তা পার হতে হয় সেটাই সময় সাপেক্ষ। শুধু সময় সাপেক্ষই নয়, যথেষ্ট বিরক্তিকর।
যেমন বাড়ি থেকে বেরিয়ে হেঁটে স্টেশনে যেতেই লেগে যায় পনেরো কুড়ি মিনিট, তারপর ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা তো আছেই। আবার ট্রেন থেকে হাওড়া নেমে কদমতলায় যাওয়া যে একটা কী ব্যাপার কহতব্য নয়।