কেন পাকিস্তান একটি জাতীয় সত্তা অর্জনে ব্যর্থ হলো? আর কেনই বা পাকিস্তান একটি টেকসই রাজনৈতিক পদ্ধতি গড়তে বিফল হলো, যাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এ উভয় অংশ সমান অংশীদার হিসেবে বসবাস করতে পারত। পাকিস্তানে জাতীয়তাবাদের উদ্ভবে নিঃসন্দেহে ভাষা, জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং সর্বোপরি ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা দ্বারা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই আঞ্চলিক, জাতিগত এবং ভাষাগত চরম বৈষম্য ও প্রকট উত্তেজনা বিরাজমান। ফেডারেল সমাধান বহু নব্য স্বাধীন আফ্রো-এশীয় দেশেই বিচিত্র জাতিসত্তাগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাষাগত এবং গোষ্ঠীগত সমস্যা সমাধানে সফল প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানে ফেডারেশন অনুরূপ সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হল কেন?
দেশের দুই অংশের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নিঃসন্দেহে এর জাতীয়তাবাদেও উন্মেষের পথে বিরাট হুমকি ছিল। কিন্তু এই আধুনিক যুগে ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো অনতিক্রম্য ব্যাপার ছিল না। এটা প্রায়ই বলা হতো যে, ধর্ম ব্যতীত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আর কিছুরই মিল ছিল না। যদি সেটাই পাকিস্তান ভাঙনের একমাত্র যুক্তি হতো তাহলে এমন কি সাধারণ অভিন্নতা পশ্চিম বাংলার বাঙালি ও মাদ্রাজিদের একই ভারত ইউনিয়নে এক সঙ্গে বসবাস সম্ভবপর করেছে?
১৯৭১ সালের পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের করুণ কাহিনি হচ্ছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী জেনারেলদের এই ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, তারা হচ্ছে ‘জাতীয় স্বার্থের রক্ষক’ এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিব এবং ‘নয়া’ পাকিস্তানের জেড এ ভুট্টো এই দুই রাজনীতিকের সন্দেহজনক ভূমিকা পালন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সংকটে বহিঃশক্তির সংশ্লিষ্টতা দ্বারাও ইন্ধন জোগানো হয়েছিল।
জি ডব্লিউ চৌধুরী তাঁর নিজের অপূর্ব অভিজ্ঞতা হতে ১৯৬৯ সালের মার্চে আইয়ুব খানের পতন হতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার পতন পর্যন্ত পাকিস্তানের ভিতরের ও বাইরের ঘটনাবলির বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বাঙালি উপজাতীয়তাবাদের উদ্ভবের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানের পর আইয়ুব-যুগের মূল্যায়ন করেছেন, যে সময়ে পাকিস্তান প্রায়ই উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য নমুনা হিসেবে বর্ণিত হতো। আইয়ুবের স্বৈরতন্ত্রী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জাতীয় ব্যাপারে বাঙালিদের কোনো উদ্যোগই ছিল না এবং এটাই ছিল দেশ ভাঙার মূল কারণ; সেই সঙ্গে যোগ হয়েছিল ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে তার সামরিক মোকাবিলার ধ্বংসাত্মক নীতি।
১৯৬৯ সালের মার্চে ইয়াহিয়া খান যখন ক্ষমতায় আসেন তখন তিনি এবং তার সামরিক সরকার পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে চূড়ান্ত এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু পূর্বেকার বাইশ বছরের দেশ দুঃশাসনে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য তার ছিল না। দেশের অখণ্ডতা রক্ষাকল্পে যে দুজন রাজনীতিকের সঙ্গে তাকে চূড়ান্ত বোঝাপড়া করতে হয় তাদের সত্যিকারের রাষ্টনায়কোচিত উদার দৃষ্টিভঙ্গির অভাব ছিল এবং সেই সাথে দেশের বাইরের কারণগুলোও এর মধ্যে বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে এবং তা বাংলাদেশের অনিবার্য উদ্ভব ত্বরান্বিত করে।