
User login
Sing In with your email
Send
Our Price:
Regular Price:
Shipping:Tk. 50
প্রিয় ,
সেদিন আপনার কার্টে কিছু বই রেখে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন।
মিলিয়ে দেখুন তো বইগুলো ঠিক আছে কিনা?
Share your query and ideas with us!
Was this review helpful to you?
or
মাতৃত্ব, সম্পর্কের জটিলতা, সিঙ্গেল মায়েদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, একজন নারীর সাহসিকতা, বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত- এই সবকিছুর সংমিশ্রণ লেখক শতাব্দী ঘোষ-এর উপন্যাস "মহুয়াকথন"। একজন সিঙ্গেল মা এবং একজন অনাথ মেয়ের জীবনালেখ্যকে পুঁজি করে রচিত হয়েছে এই উপন্যাসটি। বইটির নামকরণই যেন কাহিনির মূল আত্মাকে ধারণ করে। যদিও সম্পূর্ণ উপন্যাস জুড়ে মহুয়া শুধু একটি চরিত্র নয়; সে ভালোবাসা, অনিশ্চয়তা, পরিচয় সংকট ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক। তবুও মাঝেমধ্যে দ্বিধান্বিত হয়েছি এটা কি আসলে মহুয়াকথন নাকি অহনাকথন? কিন্তু এই উপন্যাসে লেখক একজন মেয়েকে ঘিরে বহু মানুষের জীবন, সিদ্ধান্ত ও মানসিকতার গল্প পেতেছেন। তাই নামটি যথার্থই অর্থবহ এবং কাহিনিকে সুন্দরভাবেই উত্থাপন করেছে। বইয়ের প্রচ্ছদটাও ছিল ভীষণ মায়াময়। জানালার কাছে একজন দুঃখ ভারাক্রান্ত নারী বসে আছেন চেয়ারে এবং তার সামনে দেখা যায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ছায়া। যেন প্রচ্ছদেই দেখা মেলে অহনা ও মহুয়ার সাথে। পাঠ সংক্ষেপ: পূর্বে লেখক শতাব্দী ঘোষ-এর থ্রিলার বইয়ের সাথে পরিচিত থাকলেও সামাজিক ঘরানার বই পড়া হয়নি। " মহুয়াকথন" নামটা শুনে মনে হয়েছিল হয়তো রোমান্টিক ধাঁচের হবে লেখাটা। কিন্তু যখন উপন্যাসের কয়েকটা পর্ব পোস্ট করা হয় বুঝতে পারি এটা একটা সামাজিক বই। আর বইয়ের নামটার মাঝেও একটা কেমন যেন রহস্য লুকিয়ে ছিল। তাই এই বইটা পড়ার ভীষণ আগ্রহ নিয়ে যখন পড়তে শুরু করলাম- স্বল্প কলেবরের বইটি দ্রুতই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এর রেশ কিন্তু স্বল্প সময়ে কাটেনি। একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে সমাজের কটু চাহনিকে চোখ রাঙানি দিয়ে এড়িয়ে চলেন অহনা। তবে তার মা নীলাদেবী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি মনে করেন, অহনা বিয়ে না করে ১৮ বছরের মহুয়াকে মানুষ করছে, এটা তার জীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। মহুয়াকে আগলে রাখলে নিজের একটা সুখের সংসার হবে না অহনার। একজন মা হয়ে নীলাদেবী তা মানতে নারাজ। একদিন অহনা অফিসের কাজে বাইরে গেলে নীলাদেবী মহুয়ার সামনে তুলে ধরেন চরম সত্যি এবং তাকে বাধ্য করেন হোস্টেলে চলে যেতে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী মহুয়ার জীবনে এটি এক ভয়াবহ ধাক্কা হয়ে আসে। এদিকে অহনার সহকর্মী উজান ভালোবাসে আহনাকে এবং বিয়ের প্রস্তাব দেয় নীলাদেবীর কাছে। কিন্তু তার শর্ত একটাই- মহুয়ার দায়িত্ব নিতে সে প্রস্তুত নয়। অহনা বাড়ি ফিরে মেয়েকে না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অতীতের এক ভয়াবহ স্মৃতি মনে পড়ে। তার মানসপটে উঠে আসে রাতুলের চিত্র। রাতুল একসময় অহনাকে বিয়ে করতে চাইলেও ছোট্ট মহুয়ার প্রতি তার নোংরা আচরণ জানতে পেরে অহনা বিয়ের আগের রাতে সেই সম্পর্ক ভেঙে দেন। কিন্তু সেখানেই কি শেষ? এরপর তার জীবনে অপেক্ষা করে আরও বড় দুর্যোগ। কী করে সে সামলে উঠবে? উজান ও অহনার বিয়ের পর উজান এবং তার মা, মহুয়াকে নিয়ে নানাব সমস্যা তৈরি করতে থাকে। দ্বিধান্বিত অহনা- কী করবে সে? উজানকেও ছাড়তে চায় না আর অহনাকেও না। পীযুষ নামের এক আগন্তুকের কথায় উজানের মনে সন্দেহ জন্মায়- অহনা কি সত্যিই মহুয়ার মা? অহনা কি দত্তকের গল্প ফেঁদেছে নাকি সত্যিই দপ্তক মেয়ে মহুয়া? এই সন্দেহ, সামাজিক চাপ এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন গল্পকে আরও জটিল ও আবেগঘন করে তোলে। পাঠক মনেও উঁকি দেয় নানান প্রশ্ন। কে এই পীযুষ? অহনার সাথে কী সম্পর্ক তার? মহুয়ার মা কে? কী তার জন্মের রহস্য? অহনা সব ঘটনা খুলে বলে উজানকে। তবুও সে সন্দিহান। কখনও কি সে মেনে নিতে পারবে মহুয়াকে? এগিয়ে চলে গল্প। উন্মোচিত হতে থাকে অহনা ও মহুয়ার জীবনের সত্যিগুলো। কী হবে উপন্যাসের শেষ পরিণতি? জানতে হলে পড়তে হবে "মহুয়াকথন"। চরিত্র আলোচনা: মহুয়াকথন উপন্যাসের নাম চরিত্র মহুয়া হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র অহনা। লেখক উভয়কেই প্রাধান্য দেওয়া পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রদেরও সমানভাবেই পাঠক সম্মুখে তুলে ধরেছেন। চরিত্রগুলো অতিরঞ্জিত না করে খুব সাধারণ এবং বাস্তবিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। ধীরে ধীরে উপন্যাস গড়িয়েছে সম্মুখে, পাঠকের সাথে দেখা মিলেছে চরিত্রদের। অহনা চরিত্রটি বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র। তিনি শুধু একজন মা নন, বরং সাহসী, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং মানবিক এক নারী। সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে একটি শিশুকে নিজের জীবনের কেন্দ্র বানানো তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। অন্যদিকে মহুয়া হলো নিষ্পাপ ও অনিশ্চয়তার প্রতীক যার অস্তিত্ব নিয়েই তৈরি হয় গল্পের দ্বন্দ্ব। সে পীযুষকে বিশ্বাস না করেও অহনার প্রতি যে বিশ্বাস করেছিল সেটা খুব ভালো লেগেছে। পিতৃ পরিচয়হীনতার মানসিক দ্বন্দ্বে থাকলেও সেই টানাপোড়েন তাকে অকৃতজ্ঞ বানায়নি। নীলাদেবী চরিত্রটি দ্বৈত মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি খারাপ নন; বরং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন একজন মা। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত মহুয়ার জীবনে বড় আঘাত হয়ে আসে। আর আশাদেবীকে আমার কাছে খারাপ লাগলেও ভেবে দেখেছি আসলে সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সমাজের কথা চিন্তা করে তাকে রূঢ় হতে হয়েছে। উজান চরিত্রটি বাস্তব জীবনের অনেক মানুষের প্রতিচ্ছবি বলা যায়। কিন্তু তার দায়িত্বহীনতা প্রথম থেকেই তার প্রতি একটা খারাপ ধারণা এনেছিল। তবে এটা বলা যায় লেখকের একটা মুন্সিয়ানা এখানেই ছিল। তার দ্বিধা, সামাজিক প্রভাব এবং পরবর্তী আচরণ গল্পে বাস্তবতা যোগ করে। আর রাতুল চরিত্রটি ক্ষণিকের হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তার কারণে বুঝা যায় মহুয়াকে নিয়ে কেন অহনা এত সতর্ক এবং দৃঢ়। তার উপস্থিতি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও এই চরিত্রটি উপন্যাসের একটা অন্যতম একটা পয়েন্ট ছিল। পাঠ প্রতিক্রিয়া " মহুয়াকথন" উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয় মহুয়াকে ঘিরে। এই উপন্যাসে অহনা একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী, আত্মনির্ভরশীল নারী যিনি মাতৃত্বে দুর্বল কিন্তু নিজের সঠিক চিন্তা ও যুক্তিতে অটল। সমাজের প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি ছোট্ট মহুয়াকে দত্তক নিয়ে নিজের মেয়ের পরিচয়ে লালন-পালন করেন। কিন্তু এই মানবিক সিদ্ধান্ত সমাজ সহজভাবে নিতে পারে না। নিবে-ইবা কী করে? যেখানে একজন বিধবা বা ডিভোর্সি নারী হয়ে উঠে নিয়মিত চর্চার উৎস এবং চক্ষুশূল সেখানে মহুয়ার পিতৃ পরিচয় কেউ জানে না। চারপাশের মানুষের কটূক্তি, প্রশ্ন, সন্দেহ- সবকিছুর মাঝেও অহনা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। গভীর মমত্বে আগলে রাখে মহুয়াকে। বইটি পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তার এই মাতৃত্বের গভীরতা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা কতটা গভীর হতে পারে, অহনা তা প্রমাণ করেছেন। উপন্যাসের সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক বলতে গেলে রাতুলের ঘটনাটি ছিল অন্যতম। এটি আমাদের বর্তমান সময়ের ভয়াবহ ব্যাধিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের চারপাশে এমন অনেক ভালো মানুষের মুখোশ পরা রাতুল ঘুরে বেড়ায়। তারা সুযোগ পেলেই তাদের পশু চরিত্রকে দমন করতে না পেরে মহুয়ার মতো শিশুদের উপর হামলে পড়ার আগে কোনো সংকোচ বা দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু আমাদের অন্ধ সমাজ তা দেখেও বিচার থাক দূর ধামাচাপা দেয় ঘটনা। ফলশ্রুতিতে একের পর এক ফুল ঝরে পড়ছে অকালে। কিন্তু "মহুয়াকথন" উপন্যাসে লেখক অহনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় না দিয়ে কৌশলে এসব নরকের কীটকে শায়েস্তা করতে হয়। নারীত্বের দুর্বলতাকে পাশ কাটিয়ে নিজের ও অন্যের নিরাপত্তায় সাহসী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা এই বইটি। গল্পটি পাঠককে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—মা হওয়ার জন্য কি শুধু জন্ম দেওয়া প্রয়োজন? নাকি ভালোবাসা, দায়িত্ব ও ত্যাগই প্রকৃত মাতৃত্ব? গল্পের আবেগ ধীরে ধীরে জমে ওঠে এবং পাঠককে চরিত্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত করে। বিশেষ করে মহুয়ার একাকীত্ব, অহনার অসহায়ত্ব এবং উজানের দ্বিধা—এই তিনটি অনুভূতি গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছে। কোথাও কোথাও ক্ষোভ, কোথাও মায়া, আবার কোথাও তীব্র প্রতিবাদ- সব মিলিয়ে বইটি একটি আবেগময় পাঠ অভিজ্ঞতা দেয়। যা কিছু অসঙ্গতি: সম্পূর্ণ উপন্যাসে তেমন কোনো অসঙ্গতি পাইনি। তবে উজানের ভাইবোনদের কথা উল্লেখ থাকলেও তাদের উপস্থিতি ছিল না। অহনার বিয়ের পর এই চরিত্রগুলো স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সামনে আনলে ভালো হতো। আর সম্পাদনায় টুকটাক বানান মিস্টেক ছিল। কয়েকটা বাক্যে মনে হয়েছে অসাবধানতাবশত বিরাম চিহ্ন এদিক ওদিক হয়েছে। আশা করি লেখক পরবর্তী মুদ্রণে টুকটাক ত্রুটি ঠিক করে নিবেন। বইটি কেন পড়বেন? এই বইটি কেবল একটি আনন্দসঞ্চারী উপন্যাস নয়; এটি সমাজের প্রচলিত অসঙ্গতির বিরুদ্ধে মাথা।উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়। যারা সম্পর্ক, মাতৃত্ব, সামাজিক বাস্তবতা এবং নারীর সংগ্রাম নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন, জানতে পছন্দ করেন তাদের জন্য বইটি অবশ্যই পাঠযোগ্য এবং সুখপাঠ্য। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে শিশু ধর্ষণ, দত্তক গ্রহণ, একক মাতৃত্ব এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে আলোচনা চলে, এই বইটি সেই বিষয়গুলোকে আবেগের সঙ্গে তুলে ধরে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- বইটি পাঠককে মানবিক হতে শেখায়। একটি শিশুর নিরাপত্তা, একজন নারীর আত্মসম্মান এবং সম্পর্কের দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। তাই শুধু বিনোদনের জন্য নয়, চিন্তার খোরাক হিসেবেও বইটি হতে পারে আপনার জন্য অন্যতম ভালো লাগার মতো একটি বই। প্রিয় কথামালা: "ভালোবাসা শব্দের মধ্যে যদি কারো স্বার্থ জড়িয়ে থাকে তাহলে সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে না।" "কাছের মানুষ দুটো কাছে থেকে ভালোবাসা যদি না পায়৷ তবে কি বিচ্ছেদেই হবে মুক্তি?" সর্বোপরি বলতে হয় সব মিলিয়ে মহুয়াকথন একটি আবেগঘন, বাস্তবধর্মী এবং সামাজিক বার্তাসমৃদ্ধ উপন্যাস। অহনা ও মহুয়ার সম্পর্ক পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। গল্পটি দেখায়—রক্ত নয়, ভালোবাসাই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। সমাজের বাধা, সন্দেহ এবং সংকীর্ণতা পেরিয়ে একজন নারীর মাতৃত্বের গল্পই এই বইয়ের মূল শক্তি। তাই বলা যায়, মানবিকতা ও সম্পর্কের গভীরতা অনুভব করতে চাইলে “মহুয়াকথন” অবশ্যই পড়ার মতো একটি বই। জেনে নিই: বই: মহুয়াকথন লেখক: শতাব্দী ঘোষ প্রকাশনী: বাংলার প্রকাশন প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ মুদ্রিত মূল্য: ৩৪০৳
Was this review helpful to you?
or
#মহুয়াকথন_রিভিউ_প্রতিযোগিতা বই পরিচিতি বই: মহুয়াকথন লেখক: শতাব্দী ঘোষ প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২৬ প্রকাশক: আহসান আল আজাদ প্রকাশনী: বাংলার প্রকাশন প্রচ্ছদ: আশরাফুল ইসলাম জনরা: সামাজিক উপন্যাস মলাট মূল্য: ৩৪০৳ পৃষ্ঠা:১২০ ফ্ল্যাপ: সম্পর্কের ভার বয়ে চলা কঠিন যে সম্পর্কে কোনো আন্তরিকতা থাকে না। চারপাশের কথার গুঞ্জন মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে চিন্তা করার ক্ষমতাকে কেড়ে নেয়। একজন সিঙ্গেল মা স্বাধীনভাবে একা বাঁচতে চাইলেও অসংখ্য প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়। পিতৃপরিচয়হীন মেয়েকে আসলেই কি সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করে? সমাজের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘মহুয়াকথন’ যেন এক মায়ের ভালোবাসা আর এক মেয়ের সংগ্রামের সামাজিক বাস্তবধর্মী জীবনকাহিনি। শুধু তাদের জীবনগাথা নয়, মেয়ের জীবনের সুরক্ষা দিতে এক মায়ের কণ্ঠে যেন দৃঢ় প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। কাহিনি সংক্ষেপ: আটত্রিশ বছর বয়সে এক অষ্টাদশ মেয়ে নিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসেছে অহনা। অহনা মেয়ে মহুয়াকে নিজের কাছ ছাড়া করতে পারবে না বলেই এতো দিন বিয়ের পিড়িতে বসেনি। কিন্তু নীলাদেবী মেয়ে অহনার এই সিদ্ধান্ত মানতে পারে না। সে চায় তার মেয়ের একটা সংসার হোক। একটু সুখের ছোঁয়া তার মেয়ের জীবনে আসুক। শেষ বয়সে নীলাদেবীর ইচ্ছা এটাই। অহনা মায়ের ইচ্ছা পুরন করতেই বিয়েতে রাজি হয়েছে। নতুন বউ শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের রাতেই এক অষ্টাদশী মেয়ে সঙ্গে এনেছে। কেউ পরিচয় জানতে চাইলে নিজের মেয়ের পরিচয় দেয়। বিয়ে বাড়িতে নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। নতুন বউয়ের কি তাহলে এর আগেও বিয়ে হয়েছিল? হয়তো মেয়েটা আগের পক্ষের? অথবা কারো পাপের ফসল? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে "মহুয়াকথন" পাঠপ্রতিক্রিয়া: আমাদের আশেপাশে এমন ঘটনা আছে কাহিনি আছে যা আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। এমন কি আমাদের প্রিয় মানুষ টার জীবনের নানা কথা আমাদের অজানা থেকে যায়। হয়তো কখনো জানতে চাই-ই না। মহুয়াকথন বইটা একটি সামাজিক উপন্যাস। গল্পে ফুটে উঠেছে একজন মা কিভাবে তার সন্তান কে একা হাতে মানুষ করেছে। সমাজের নানা কথা সহ্য করে বাবাহীন মেয়েকে বড়ো করে তোলে একটি খানি কথা নয়। এযেন এক বড় যুদ্ধে লড়ার মতো। সমাজ সিঙ্গেল মায়েদের ভালোর চোখে দেখে না। কিন্তু এর জন্য সমাজই দায়ী। লেখক তার লেখনীর মাধ্যমে সমাজের এই বাস্তব রূপ খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। চরিত্র বিশ্লেষণ: চরিত্র গুলোই খুব সুন্দর। আমাদের মনমানসিকতা সব সময় এক থাকেনা। কখনো রাগ,কখনো অভিমান, কখনো শান্ত, কখনো নিরব, কখনো আপন মানুষগুলোর উপর অভিযোগ থাকে। তেমনি চরিত্র গুলোও একেক সময় একেক রকম। সব গুলো চরিত্রকেই সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। প্রচ্ছদ ও নামলিপি: প্রচ্ছদ টা খুবই চমৎকার ও সুন্দর। প্রচ্ছদই যেন গল্পের মূলভাব বলে দেয়। বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ দুইটাই চমৎকার। কোয়ালিটি ও বাধাই : বইয়ের বাধাই ও কোয়ালিটি দুইটাই ভালো। পছন্দের লাইন: ▪️কাউকে ভালবাসলে কি জোর করে তাকে দিয়ে কোনো কাজ করানোর অধিকার থাকে? ভালবাসা শব্দের মধ্যে যদি কারো স্বার্থ জড়িয়ে থাকে তাহলে সত্যিকারের ভালবাসাটা থাকে না। ▪️বইয়ের পাতাত মতো জীবনের পাতা উল্টে যদি দেখা যেত কাল কি হবে? তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে কেউ ভুল করত না। রেটিং: ৪.৯/৫ লেখা: নিপানুর বিনতে নুরনবী তারিখ: ১৯/০৪/২০২৬
Was this review helpful to you?
or
#বুক_রিভিউ বইঃ মহুয়াকথন লেখিকাঃ শতাব্দী ঘোষ জনরাঃ সমকালীন উপন্যাস প্রকাশনীঃ বাংলার প্রকাশন মলাট মূল্যঃ ৩৪০ টাকা রিভিউদাতাঃ ফারহানা তাবাসসুম ~ ★কাহিনী সংক্ষেপঃ গল্পটি মা-মেয়ের। মেয়েকে ঘিরে এক মায়ের প্রতিবাদী হওয়ার অসাধারণ গল্প। অষ্টাদশী মহুয়া আঠারো টা বছর মা অহনার ছায়াতলে বড় হওয়ার পর একসময় জানতে পারে যাকে সে এত বছর ধরে মা বলে জেনে এসেছে, যে মাকে ছাড়া সে অসহায়, মা ছাড়া তাকে ভালোবাসার কেউ সেই মানুষটি তার নিজের মা নয়! অহনা তাকে দত্তক নিয়েছে। মহুয়া অহনার পালিত মেয়ে। মহুয়াকে নিজের মেয়ে বলে আগলে রাখতে যেয়ে নিজের জীবনটা ত্যাগ করে এসেছে। নিজের জীবনটা গুছায়নি, কখনো নিজের সংসার করার কথা চিন্তা করেনি। শুধু মহুয়ার জন্য নিজের আটত্রিশ টা বছর সঙ্গীহীন থেকেছে। সেই চরম সত্য টা জানার পর মহুয়ার জীবনটা বদলে গেলো। এলোমেলো হয়ে গেলো সব। নিজের পরিচয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকে। অহনার মা নিজের মেয়ের জীবন গুছাতে বিয়ে দিতে চেয়েছিল কয়েকবার। একবার বিয়ে ঠিকও হয়েছিল, কিন্তু কোনো এক জঘন্য সত্য জানার পর অহনা সেই সম্পর্ক আর গড়তে দেয়নি। মেয়ের জন্য হয়ে উঠেছিল রুদ্রনী। আচ্ছা কি এমন ঘটেছিল সেদিন! জীবন প্রবাহমান। সময়ের কাছে থেমে থাকে না। অহনার আটত্রিশ তম বয়সে এসে অহনার মা অহনাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য জোড়াজুড়ি করতে থাকে। শেষ বয়সে মেয়ের সুন্দর একটা গুছানো সংসার দেখে যেতে চায়। উজান অহনার অফিস কলিগ সাথে ভালো বন্ধু। বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্ক টা বিয়ে অবধি নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু শর্ত মহুয়াকে সে বিয়ের পর নিজের জীবনে জড়াতে পারবে না। অন্যের মেয়েকে নিজের বলে চালিয়ে নিতে পারবে না কখনো। কিভাবে যেন অহনা উজানকে মানিয়ে নিজেও বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। বিয়ের পর শুরু হয় দুজনের বাকবিতন্ডা। বিয়ে নিয়ে দ্বন্দ্বে ভুগে দুজনই, আচ্ছা কোনো ভুল করলো না তো। উজান কোনো ভাবেই মহুয়াকে মেনে নিতে পারছিল না। যার কারণে দুজনের সাংসারিক জীবনে কলহ তৈরি হয়। অহনাও মাঝ নদীতে পড়ে যায় কাকে বেছে নেবে সে মহুয়া নাকি উজান! এতটা বছর যে মেয়ের জন্য নিজের এত যুদ্ধ তাকে ছাড়া অহনা কিভাবে থাকবে! এরপর অহনা আর উজান দুজনের মান অভিমানের সময় আগমন ঘটে পীযূষ নামের এক আগুন্তকের। যে উজানের কাছে এমন কিছু বলে যার জন্য ওদের মাঝে আরও অশান্তির সৃষ্টি হয়। আচ্ছা মহুয়ার আসল জন্ম পরিচয় কি! কি তার জন্মের করুণ সত্য যা সে কাউকেই বলতে চাচ্ছে না? কার কাছে সে ওয়াদা বদ্ধ? কে সেই ব্যক্তি? অহনা কি মহুয়াকে সারাজীবন নিজের কাছে আগলে রাখতে পারবে নাকি কোনো এক অতীত এসে আবার মহুয়াকে তার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে? মহুয়া কি করবে তখন! উজান কি কোনোদিন মহুয়াকে মেনে নিতে পারবে? অহনা কি পাবে না উজান আর মহুয়াকে নিয়ে স্বপ্নের সুন্দর এক সংসার? শেষ পর্যন্ত গল্প কোন দিকে মোড় নেবে? ~ ★চরিত্র বিশ্লেষণঃ গল্পের চরিত্রে রয়েছে মহুয়া, অহনা, উজান, নীলাদেবী, আশাদেবী, ঈশান, রাতুল আরও অনেকে। ★অহনাঃ গল্পের অন্যতম এক অনন্য চরিত্র। যে চরিত্র টি আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। পেটে ধরলেই যে শুধু মা হওয়া যায় না, মা হতে লাগে আত্নিক এক সম্পর্ক, ভালোবাসা। যা অহনা পুরোটা গল্পে দেখিয়ে গিয়েছে। মেয়ের জন্য সে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। ★মহুয়াঃ এ এক মা ভক্ত মেয়ে। মা ছাড়া যার জীবন অস্তিত্বহীন। নিজের জীবনের চরম সত্য জানার পর কিভাবে যেন নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিতে চেয়েছিল শুধুমাত্র মায়ের ভালোর জন্য। নিজের অতীত এসে হানা দিলেও অহনা ছাড়া কারও কথায় কান দেয়নি। ★উজানঃ প্রথমদিকে চরিত্রটির প্রতি মন্দ লাগা সৃষ্টি হলেও ধীরে ধীরে চরিত্র টা ভালো লাগছিল। বেশির ভাগ পুরুষই চাইবে না তার নতুন দাম্পত্য জীবনে নিজের স্ত্রীকে স্ত্রী মেয়ের জন্য কাছছাড়া করতে। বারবার নিজেদের জীবনে সেই মেয়ের গুরুত্ব মেনে নিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উজান চরিত্র খুব চমৎকার এক কাজ করেছিলো যেটা খুব মনে লেগেছে। ★নীলাদেবীঃ সবসময় সন্তানের ভালো করতে চেয়ে কখনো কখনো যে পরিস্থিতি দুর্বিষহ হয়ে পড়ে তার সিদ্ধান্ত গল্পে অন্যতম এক দৃষ্টান্ত। ~ ★পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ গল্প টা মহুয়াকে ঘিরে হলেও গল্পের প্রধান চরিত্র টি হচ্ছে অহনা। যে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে মেয়েকে সব পরিস্থিতিতে আগলে রেখেছে। মেয়ের জন্য হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদী মা। যার জন্য সে অন্য সম্পর্কও তুচ্ছ করে দিতে দুবার ভাবেনি। এ এক প্রতিবাদী মায়ের প্রতিবাদী এক গল্প। গল্পের শেষ টা অসাধারণ ভাবে সমাপ্তি টেনেছে লেখিকা। যা পড়ে পাঠক খুব তৃপ্তি পাবে।
Was this review helpful to you?
or
“নিজের সব দুর্বলতার জায়গা কখনো কাছের মানুষকে বলতে নেই। কাছের মানুষগুলো দুঃসময়ে দুর্বল বিষয়ে আঘাত করে।” ~ শতাব্দী ঘোষ এবারের বইমেলায় প্রকাশিত শতাব্দী ঘোষের 'মহুয়াকথন' উপন্যাসটি নিয়ে ছোটো একটি রিভিউ। মাতৃত্ব, ভালোবাসা আর সন্দেহের দোলাচলে আবর্তিত এই গল্পটি আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে লেখা এই উপন্যাসটি পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটি ছোটো রিভিউ লিখে ফেললাম। যারা সুস্থ ধারার সামাজিক গল্প পছন্দ করেন, আশা করি তাদের ভালো লাগবে। ভূমিকা: শতাব্দী ঘোষের পঞ্চম উপন্যাস মহুয়াকথন (২০২৬)। এর আগে তিনি থ্রিলার ও রোমান্টিক জনরার বই লিখেছিলেন। তবে ‘মহুয়াকথন’ উপন্যাসে তিনি সামাজিক বাস্তবতার দিকটি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। যারা সামাজিক জনরার বই পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার বই হতে পারে। নামকরণ: সাহিত্যে নামকরণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো উপন্যাসের নাম সাধারণত গল্পের কাহিনি, প্রধান চরিত্র অথবা অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের সাথে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়। ‘মহুয়াকথন’ উপন্যাসটির নামকরণ করা হয়েছে উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মহুয়া’-র নামানুসারে। সেই দিক থেকে নামকরণটি যথার্থ এবং কাহিনির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাঠ প্রতিক্রিয়া: রমজান মাস চলছে বিধায় তেমন বই পড়া না-হলেও এই বইটি অবসরে পড়ে শেষ করলাম। উপন্যাসটিতে একজন সিঙ্গেল মাদারের জীবনসংগ্রামের কথা ফুটে ওঠেছে। উপন্যাসটি ছিল বেশ সুখপাঠ্য। তাই পড়া শেষ করে ছোট করে রিভিউ লিখতে বসে পড়লাম। সার-সংক্ষেপ: ‘অহনা’ একজন সিঙ্গেল মাদার। তার মেয়ে ‘মহুয়া’। তবে মহুয়ার বাবা কে সেটা উপন্যাসের শুরুতে পরিষ্কার করা হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই পাঠকমনে কৌতূহল জাগবে যে, মহুয়ার বাবা আসলে কে? বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও মহুয়ার জন্য এখনো বিয়ে করেনি অহনা। তাই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অহনার মা নীলাদেবী মহুয়াকে হোস্টেলে রেখে আসেন। কিন্তু অহনার জোরাজোরিতে অবশেষে আবার মহুয়াকে বাড়িতেই ফিরিয়ে আনেন। সহকর্মী উজানের সাথে অহনার বেশ ভালো সম্পর্ক। কিন্তু মেয়ে মহুয়ার কথা ভেবে সে বিয়েতে রাজি হয় না। একপর্যায়ে উজান মহুয়াকে মেনে নিয়েই অহনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। ভাবে বিয়ের পর নতুন সংসার হলে অহনা নিশ্চয়ই মহুয়ার কথা তেমন ভাববে না। তখন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আসলেই কি সব ঠিক হয়? বিয়ের পর মহুয়াকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেলে পাড়া-পড়শিরা নানান কথা বলে। উজানের মা এমনকি উজানও বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নেয় না। ফলে শুরু হয় সংসারে অশান্তি। মহুয়ার প্রতি অহনার এত বেশি ভালোবাসা দেখে সবার মনেই সন্দেহের সৃষ্টি হয় মহুয়াকে নিয়ে। বারবার মনে প্রশ্ন আসে, মহুয়ার বাবা কে? সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় যখন পীযূষ নামের এক লোক উজানকে ফোন করে মহুয়াকে তার মেয়ে বলে দাবি করে। অহনাকে যখন পীযূষ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন সে চুপ করে থাকে, কখনো বা মাথা ঘুরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। বোঝাই যায়, পীযূষের সাথে তার অতীত জড়িয়ে আছে। পীযূষ কে? অহনার সাথে তার কি সম্পর্ক? মহুয়া কার মেয়ে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে উপন্যাসটি। চরিত্র বিশ্লেষণ: অহনা: গল্পের প্রধান চরিত্র। সে একজন সিঙ্গেল মাদার। সেই ছোট্টবেলা থেকে মহুয়াকে লালনপালন করে বড়ো করেছে। সে সবকিছুর চাইতে মহুয়াকে বেশি ভালোবাসে। একপর্যায়ে উজানের সাথে বিয়ে হলেও সে মহুয়াকে একা রাখতে পারে না। শ্বশুরবাড়িতে অনেক কটূক্তি সহ্য করেও সে মহুয়ার হাত ছাড়ে না। মহুয়াকে শক্ত করে আগলে রাখে। তাকে মমতাময়ী মা বলা যায়, যে নিজের সন্তানের মঙ্গলের জন্য সবার সাথে লড়াই করতে পারে। মহুয়া: মা-ভক্ত মেয়ে। বয়স আঠারো হলেও এখনো মা ছাড়া কিছুই বুঝে না। একমুহূর্ত মাকে না দেখলে কান্না করে। তাকে নিয়ে মায়ের শ্বশুরবাড়িতে সমস্যা হচ্ছে জানার পর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলেও যেন পারে না। অহনার সাথে যেন সে অদৃশ্যভাবে বাঁধা। তার বাবার পরিচয়ও কখনো সে জানতে চায়নি। তার কাছে তার মা-ই সব। নীলাদেবী: অহনা যেমন তার মেয়ে মহুয়ার ভালো চায় ঠিক তেমনি নীলাদেবীও তার মেয়ে অহনার ভালো চান। অহনার ভালোর জন্য মহুয়াকে নানা ভৎসনাও তিনি করেছেন। পরক্ষণে আবার মহুয়ার জন্যেও কান্না করেছেন। তিনি যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিলেন। একবার মেয়ের ভালোর জন্য মহুয়াকে দূরে রাখতে চান তো আরেকবার স্নেহের টানে মহুয়াকেই আপন করে নেন। নীলাদেবীর চরিত্রে আমরা একজন আদর্শ মায়ের চরিত্র দেখতে পাই বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তিনি যে তার মেয়ের কল্যাণ চান আবার স্নেহ-মায়া-মমতাও বিসর্জন দিতে পারেন না মহুয়ার প্রতি। উজান: একজন বাস্তববাদী চরিত্র। স্ত্রীর সাথে তার অষ্টাদশী মেয়েকে কোন স্বামী-ই বা সহজভাবে মেনে নেবে? তারপরেও সে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, মহুয়ার আসল পরিচয় জানতে চাওয়ার পরেও অহনা যখন বলেনি স্বাভাবিকভাবেই তখন সন্দেহের সৃষ্টি হবে। তাছাড়া পীযূষ নামের একজন তাকে কল দিয়ে নানা কথা বললেও সে সহজে এগুলো বিশ্বাস করতে চায়নি। আবার পুরোপুরি অবিশ্বাসও করতে পারেনি। এজন্যই আমার কাছে উজান চরিত্রটা বাস্তববাদী মনে হয়েছে। যদি যে শুরু থেকেই মহুয়াকে বিনাবাধায় মেনে নিতো, পীযূষের বলা কথাগুলো মোটেই বিশ্বাস করত না তাহলে সে হতে পারত উপন্যাসের মহৎ কোনো চরিত্র কিন্তু বাস্তববাদী হতে পারত না। পরিশেষে সব চরিত্র বিশ্লেষণ করে বলা যায়, প্রত্যেকটি চরিত্রের মধ্যে কেমন যেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। কেউ যেন কোনো সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেনি। সবাই কেমন যেন দু-টানার মধ্যে ছিল। উপন্যাসের শেষে এসে সেই দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তির সাথে সাথে উপন্যাসেরও সমাপ্তি ঘটেছে। অর্থাৎ উপন্যাসের কাহিনি এগিয়েছে এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে। লেখনশৈলী: লেখিকা শতাব্দী ঘোষ সহজ ও সাবলীল ভাষায় গল্পটি উপস্থাপন করেছেন। বর্ণনাভঙ্গি স্বাভাবিক এবং ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়ায় পাঠকের কৌতূহল বজায় থাকে। উপন্যাসের সংলাপগুলো বেশ বাস্তবধর্মী, যা চরিত্রগুলোর আবেগ ও মানসিক টানাপোড়েনকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। পাশাপাশি মাতৃত্বের আবেগ এবং সামাজিক সংকটের যে আবহ উপন্যাসটিতে তৈরি হয়েছে, তা পাঠককে গল্পের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। বইয়ে পছন্দের কয়েকটি উক্তি: বইয়ের বেশ কয়েকটি উক্তি আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি উক্তি নিচে তুলে ধরলাম। ১. নিজের সব দুর্বলতার জায়গা কখনো কাছের মানুষকে বলতে নেই। কাছের মানুষগুলো দুঃসময়ে দুর্বল বিষয়ে আঘাত করে। ২. জীবনের কিছু সময়ে এমন মুহূর্ত আসে ইচ্ছে করলেও যাকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। ৩. কঠিন সময়ের অভিযোগ, মান-অভিমানগুলোকে অস্বীকার করে যদি পথ চলা যেত তাহলে জীবনের পথ চলা অনেক সহনীয় হতো। ৪. ‘ভালোবাসা’ শব্দের মধ্যে যদি কারো স্বার্থ জড়িয়ে থাকে তাহলে সত্যিকারের ভালোবাসা থাকে না। ৫. কাছের মানুষ দুটো কাছে থেকে ভালোবাসা যদি না-পায়, তবে কি বিচ্ছেদেই হবে মুক্তি? উপর্যুক্ত উক্তিগুলো যেন আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। উপসংহার: সামাজিক জনরার গল্প পছন্দ করলে পড়ে ফেলুন ‘মহুয়াকথন’ বইটি।
Was this review helpful to you?
or
রিভিউ: মহুয়াকথন লিখেছেন শতাব্দী ঘোষ প্রকাশনী: বাংলার প্রকাশন পৃষ্ঠা: ১২০ “মহুয়াকথন” মূলত এক সিঙ্গেল মা অহনা ও তার মেয়ে মহুয়ার জীবনসংগ্রামের গল্প। সমাজের কটূক্তি, আত্মীয়স্বজনের চোখ রাঙানি, আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সবকিছুকে উপেক্ষা করে অহনা নিজের জীবনতরী বেয়ে চলেছে শুধুই মেয়েকে বুকে আগলে রাখার শক্তিতে। এই গল্পে মাতৃত্ব শুধু সম্পর্ক নয়, এক অনমনীয় অবস্থান। অহনার জীবনে ভালোবাসার নতুন দিগন্ত হয়ে আসে উজান। প্রথমদিকে উজান যেন আশ্রয়, স্থিরতা ও নতুন শুরুর প্রতীক। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় তখনই, যখন সে মহুয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। এখানে গল্পটি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে যায় কারণ এক সিঙ্গেল মাকে ভালোবাসা আর তার সন্তানকে নিজের মতো করে গ্রহণ করা দুটো এক নয়। অন্যদিকে নীলাদেবী, অহনার মা, মেয়ের ‘স্বাভাবিক’ বিবাহিত সুখ দেখতে চান। তাঁর মানসিকতা সমাজের সেই অংশের প্রতিচ্ছবি, যারা ভালো চাইলেও সামাজিক কাঠামোর বাইরে ভাবতে পারে না। ফলে তৈরি হয় টানাপোড়েন, মায়ের দায়িত্ব বনাম নারীর ব্যক্তিগত সুখ। উজান ও অহনার বিয়ে হয় ঠিকই, কিন্তু তারপর? গল্পের আসল দ্বন্দ্ব শুরু হয় বিয়ের পরেই। মহুয়ার সরল, মা কেন্দ্রিক পৃথিবী কি ভেঙে পড়ে? নাকি অহনা নিজের সমস্ত সত্তা বিলিয়ে মেয়েকে আগলে রাখে? এই গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর আবেগের গভীরতা। মহুয়ার চরিত্র নির্মল ও নির্ভরশীল; তার চোখ দিয়ে আমরা দেখি এক শিশুমনের ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা। অহনা চরিত্রটি শক্তিশালী, কিন্তু সেই শক্তির ভিতরে লুকিয়ে আছে ভাঙাচোরা স্বপ্ন, অপরাধবোধ, আর সন্তানের প্রতি অগাধ টান। উজান চরিত্রটি ধূসর পুরোপুরি খল নয়, আবার নির্দোষও নয়। তার দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতাই গল্পকে বাস্তবসম্মত করে তোলে। গল্পের গতি চমৎকার। আবেগের ওঠানামা পাঠককে ধরে রাখে। সংলাপগুলো স্বাভাবিক, বিশেষ করে মা মেয়ের মুহূর্তগুলো হৃদয়ছোঁয়া।ছিমছাম মেদহীন উপন্যাস। ক্লাইম্যাক্সে এসে প্রশ্নটা জোরালো হয়ে ওঠে একজন মায়ের ভালোবাসার সামনে কি সব শর্ত তুচ্ছ হয়ে যায়? সব মিলিয়ে, মহুয়াকথন শুধু একটি সম্পর্কের গল্প নয়; এটি সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে মাতৃত্বের অদম্য শক্তির কাহিনি। যারা আবেগঘন পারিবারিক গল্প পছন্দ করেন, বিশেষ করে মা ও সন্তানের সম্পর্ককেন্দ্রিক কাহিনি তাদের জন্য এই গল্প নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর ও ভাবনার খোরাক জোগাবে। বই হোক সবসময়ের সঙ্গী। লেখিকার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।




