জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে আমি মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং সামাজিক মূল্যবোধকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমার কাজ এবং গবেষণার পরিধি মূলত আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং অর্থনীতির জগতে হলেও, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় আমি অনুভব করেছি যে, জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল পেশাগত দক্ষতায় পাওয়া সম্ভব নয়। মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা এবং প্রশ্ন করার অভ্যাস-এই বিষয়গুলোই মানুষকে প্রকৃতভাবে গড়ে তোলে।
‘অমৃতের সন্তানেরা’ লেখার পেছনে রয়েছে এই উপলব্ধিগুলোকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়াস। গল্পের মূল চরিত্রগুলো কিশোর-তরুণদের মনস্তত্ত্ব, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। চরিত্রগুলোর মাধ্যমে আমি চেষ্টা করেছি সমাজের বাস্তবতা, সম্পর্কের মূল্য, প্রশ্ন করার গুরুত্ব, এবং জীবনের গভীর সত্যগুলো তুলে ধরতে। একদিকে যেমন এই উপন্যাস পাঠককে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো বিষয় নিয়ে ভাবাবে, তেমনি স্পর্শের শক্তি, লাইব্রেরির গুরুত্ব, এবং আত্ম-উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতেও আলোকপাত করবে।
এই উপন্যাস কেবল কিশোর-তরুণদের জন্য নয়, এটি তাদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের জন্যও। যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে গড়ে তুলতে চান, তাদের জন্য এই গল্প একটি নির্দেশিকা হতে পারে। প্রতিটি পাঠক নিজের অবস্থান, চিন্তা, এবং দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে।
‘অমৃতের সন্তানেরা’ বলতে আমি বুঝিয়েছি আমাদের কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের অমিত সম্ভাবনাকে। অমৃত শব্দটি শুধু অমরত্বের প্রতীক নয়, এটি জ্ঞানের, মানবিকতার এবং উন্নত চরিত্রের প্রতীক। প্রতিটি তরুণ-তরুণীর ভেতরেই এই অমৃতের স্ফুলিঙ্গ রয়েছে। তারা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা, নৈতিক শিক্ষা এবং আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ পায়, তবে তারা হয়ে উঠতে পারে আলোকিত ভবিষ্যতের নির্মাতা। এই নামের মাধ্যমে আমি পাঠকদের আহ্বান জানাতে চেয়েছি, তারা যেন নিজেদের ভেতরের সেই শক্তি ও সম্ভাবনাকে চিনতে পারে এবং সেটি বিকশিত করতে সচেষ্ট হয়।
ড. আনিসুর রহমান ফারুক, জন্ম বাংলাদেশে। পেশায় শিক্ষক। শিক্ষাজীবনে অসাধারণ সাফল্যের অধিকারী, রাষ্ট্রপতিপদকপ্রাপ্ত। তিনি বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রশাসনে বিবিএ, এমবিএ সমাপ্ত করে জাপান সরকারের মর্যাদাপূর্ণ মনবুশো স্কলারশিপে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৯ সালে ‘উন্নয়ন অর্থনীতি’—তে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৪ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্যানটারবারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও ব্যবসায়’ বিষয়ে পিএইচডি ও ২০২১ সালে ফিনল্যান্ডের Lut University থেকে একই বিষয়ে তিনি দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশের নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ফিনল্যান্ডের University of Vaasa—তে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। গবেষণায় সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ড: European International Business Academy Best Paper Award 2017, Vaasa Conference on International Business Best Paper Award 2019। তিনি দুটি আন্তর্জাতিক জার্নালের সহযোগী সম্পাদক এবং বেশ কয়েকটি জার্নালের সম্পাদকীয় রিভিউ বোর্ডের সদস্য। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা জার্নালে তাঁর পঞ্চাশের অধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনীর ব্যানারে আছে তাঁর বেশ কিছু ব্যতিক্রমী বই। শিক্ষা, শিক্ষকতা ও গবেষণায় সাফল্যের পর একধরনের দায়বোধ থেকেই তাঁর ধর্ম নিয়ে গবেষণা, লেখালেখির শুরু। কোরআন নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে এতোটাই আলোড়িত হোন যে, তিনি তাঁর অনুভূতি এবং উপলব্ধির কথা বাংলাভাষাভাষি মানুষের কাছে পৌঁছানোকে নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন। একজন বিজ্ঞানমনস্ক গবেষকের চোখ ও মন দিয়ে ধর্মকে বিবেচনা করেন বলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি উদার।