অন্ধকারের গভীরতা ভেদ করে যেভাবে ভোরের আলোর স্ফুরণ ঘটে দুনিয়ায়, যেভাবে খরাগ্রস্ত ধরণীতে নেমে আসে গা জুড়ানো বৃষ্টি, প্রখর রৌদ্রতাপে মেঘদল যেভাবে যমিনজুড়ে বিছিয়ে দেয় শীতলতার চাদর, একদিন তেমনই উপলক্ষ্য তৈরি করে দুনিয়ায় আগমন ঘটেছিল রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। জাহিলিয়াতের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে, পাপ আর পঙ্কিলতার মাঝে ডুবে থাকা সেই আরব্য সমাজে তিনি ছড়িয়েছিলেন আসমানি আলোর সৌরভ। যেসকল অন্তরকরণে ঘন হয়ে উঠেছিল অবাধ্যতার আস্তরণ, নবিজির মায়ামাখা স্পর্শ আর দয়ামাখা সঙ্গ পেয়ে সেসব ধুয়েমুছে গেল চিরতরে। অন্ধকারে তলিয়ে থাকা মানুষগুলো পরিণত হলো সোনার মানুষে।
যে পবিত্র মানুষটা পাল্টে দিয়েছিলেন সভ্যতার গতিপথ, যার হাতে বদলে গিয়েছিল মানুষের চিন্তার জগত, যিনি ধরণীকে রাঙিয়েছেন ঐশী আলোয়, তাঁর জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকবে মণিমুক্তো, গোটা বিশ্ববাসীর জন্য তিনি হয়ে উঠবেন আদর্শের প্রতীক—এই তো স্বাভাবিক ঘটনা।
ইসলামের সুমহান ইমাম, ফকিহ ও তাফসিরশাস্ত্রবিদ ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ তার সুবিখ্যাত ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ তে গ্রন্থবদ্ধ করেছিলেন পৃথিবীর পূর্বাপর সকল ইতিহাস ও ঘটনা। সৃষ্টিজগতের রহস্য, পৃথিবীর ইতিহাস, ইসলামের আবির্ভাব এবং সোনালি যুগগুলোর ধারাবাহিক পরম্পরা থেকে শুরু করে কিয়ামত দিবসের আলামতসমূহও স্থান পেয়েছে কালজয়ী সেই গ্রন্থে। বলাই বাহুল্য, সেই গ্রন্থের বিশাল অংশজুড়ে তিনি তুলে ধরেছেন রাসুলে আরাবির জীবনচরিত। আমাদের বক্ষমাণ এই সীরাত-গ্রন্থটি, আজ থেকে সাড়ে ছয়শো বছর আগে রচিত সেই সুবিখ্যাত ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ থেকে উৎসারিত। মূল গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ থেকে সীরাতের এই অংশটুকু আলাদা করে সংকলন করেছেন শাইখ মুহাম্মাদ আবু হুসাইন আবু যাহরা।
সুপরিসরভাবে নবি জীবনকে জানতে এবং বুঝতে, একটি সুপ্রাচীন সীরাতের বইতে ডুব দিয়ে সাড়ে চৌদ্দ’শ বছর আগের পৃথিবীতে হারিয়ে যেতে চাইলে ‘সীরাতে ইবনে কাসীর’ পাঠকের জন্য হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য সীরাতগ্রন্থ।
আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. এর জন্ম ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে বসরার (বর্তমান সিরিয়া) মামলুক সালতানাতে। তার পুরো নাম ইসমাঈল ইবন উমর ইবন কাসীর ইবন দূ ইবন কাসীর ইবন দিরা আল-কুরায়শী হলেও তিনি ইবনে কাছীর নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি কুরায়েশ বংশের বনী হাসালা গোত্রের সন্তান। তার জন্মস্থান এবং জন্ম তারিখ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তার শিক্ষাজীবন এবং শৈশব নিয়েও খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তবে মামলুক সালতানাতেই তিনি বড় হয়েছেন, এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ নিশ্চিত। কৈশোরে তিনি ফিরিঙ্গীদের যুদ্ধ, ক্রুসেড, তাতারদের আক্রমণ, শাসকদের অন্তর্কোন্দল, বিদ্রোহ করে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির মতো যাবতীয় দুর্যোগ আর দুর্দশা দেখে দেখে বড় হয়েছেন। কর্মজীবনে ইবনে কাছীর রহ. উন্মুসসা’ ওয়াত তানাকুরিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন। কুরআন, হাদিস, তাফসির, ইতিহাস, গণিত সহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি বিচরণ করেন। শায়খ তকী উদ্দী (রহঃ), উস্তাদ হাজরী (রহঃ), ইবনুল কালানসী (রহঃ) প্রমুখ প্রবাদত্যুল্য শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজের জ্ঞানের আলোয় তিনি আলোকিত করেছিলেন মধ্যযুগীয় মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের। ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে তার মৃত্যু হয়। আল্লামা ইব্নে কাছীর রহ. এর বই সমূহ ইসলামি দর্শন, ফিকহ শাস্ত্র, তাফসির ও ইতিহাস নির্ভর। তার রচিত ‘তাফসিরে ইবনে কাছীর’-এর জন্য তিনি বিশ্বজোড়া সমাদৃত। পবিত্র কুরআনের কাছীরগুলোর মাঝে তার এই গ্রন্থটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং প্রামাণ্য। ১১ খণ্ডে প্রকাশিত ‘তাফসিরে ইবনে কাছীর’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, ‘কিতাবুল আহকাম’ সহ বেশ কিছু জ্ঞানগর্ভ বই রয়েছে আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. এর বই সমগ্রতে।