ইউরেকা, আমার আমেরিকাÑএকটি ভ্রমণগ্রন্থ, আবার একই সঙ্গে এক প্রবীণ মানুষের আজীবনের স্বপ্নপথের অনুপম দলিল। লেখক কাজি গোলাম মাইন উদ্দীন তাঁর ৯৪ বছরের জীবন-জমানো অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও আবেগকে সাজিয়েছেন এই গ্রন্থে। আমেরিকা ভ্রমণের সময় তিনি ডায়েরি, নোটবুক, এমনকি টিস্যু পেপারেও ঘটনাগুলো টুকে রেখেছিলেনÑঠিক যেন স্মৃতিকে হারাতে না দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস।
গ্রন্থটি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন লেখকের চতুর্থ সন্তান তানভীর আলাদিন। দীর্ঘ আট বছর ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই কাগজপত্র সংগ্রহ, লেখকের হাতের লেখা থেকে তথ্য উদ্ধার, করোনাকালীন স্থবিরতার ধাক্কা সামলে নতুনভাবে পাণ্ডুলিপি সাজানোÑসবটাই হয়েছে পরম যত্নে, দায়িত্ববোধে। লেখকের বয়সজনিত স্মৃতিভ্রমের কারণে কিছু তথ্য যাচাই ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে; প্রয়োজনে প্রযুক্তি ও গবেষণারও সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
এ গ্রন্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লেখকের গভীর ব্যক্তিগত অনুভবও। বইটি হাতে পেতে তিনি অপেক্ষায় ছিলেন; প্রবাসে থাকা তাঁর দুই ভাইকে নিজ হাতে কপি তুলে দেওয়াও ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু পাণ্ডুলিপি হস্তান্তরের পরপরই তাঁর ভাই ড. কাজি গোলাম মহিউদ্দিনের অকাল প্রয়াণ লেখকের মনকে ভারাক্রান্ত করে দেয়। তাই আমাদের সাধ্য শুধু এই যেÑ লেখকের জীবদ্দশায় বইটি তাঁকে এবং পাঠকসমাজকে পৌঁছে দেওয়া।
লেখকের অন্যন্য গ্রন্থের মতোÑ ডাকঘরে ঘোড়ার ডাক, তাসের ঘরে মাধবীলতা ও খাজু উকিলের ডায়েরিÑ এই বইটিও পাঠককে দেবে এক আলাদা স্বাদ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাদা রাজ্যের ভ্রমণকথা এখানে এসেছে এক প্রবীণ পর্যটকের নির্মল চোখে দেখা অভিজ্ঞতার ভাষায়Ñ সরল, অকপট ও জীবনঘনিষ্ঠ।
আমরা বিশ্বাস করি, পাঠক এই বইয়ে একাধারে খুঁজে পাবেন ভ্রমণের তথ্য, ব্যক্তিগত স্মৃতির উষ্ণতা এবং সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া গল্পের আন্তরিকতা। লেখকের দীর্ঘ জীবনের পথচলা, তাঁর পরিবারের গল্প, ভাইবোনদের সফলতাÑ সব মিলিয়ে এটি এক সমৃদ্ধ উপাখ্যানও বটে।
কাজী গোলাম মাইন উদ্-দীন একজন স্বনামধন্য কবি, প্রবীণ কর আইনজীবী এবং সমাজসেবক, যিনি দীর্ঘ কর্মজীবনে সাহিত্য, আইন এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ফেনী সদর উপজেলার মাথিয়ারা কাজি বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কাজী গোলাম মাইন উদ্-দীন। ১৯৫৩ সালে ফেনী হাই স্কুল থেকে মেট্রিক এবং ফেনী কলেজ থেকে আই.কম ও বি.কম পাস করেন। তিনি পৈত্রিক ব্যবসা 'কাজি কেমিক্যাল ওয়ার্কস' পরিচালনা করেন এবং ১৯৬৯ সালে আয়কর উপদেষ্টা হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। তিনি ফেনী জেলা কর আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ফেনী ল’ কলেজের প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন। লায়ন্স ক্লাব ফেনীর সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি মাথিয়ারা জামে মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত। সাহিত্যচর্চায়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০০৯ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘তাসের ঘরে মাধবীলতা’ প্রকাশিত হয়। তিনি বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় ভ্রমণ করেছেন এবং তিনবার আজমীর শরীফ জিয়ারত ও দুইবার হজ পালন করেছেন। প্রকাশিত বইসমূহ কাজী গোলাম মাইন উদ্-দীন এর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘তাসের ঘরে মাধবীলতা’ (২০০৯) ‘ডাকঘরে ঘোড়ার ডাক’ উপসংহার কাজী গোলাম মাইন উদ্-দীন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, যিনি সাহিত্য, আইন এবং সমাজসেবায় তাঁর অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।