এ গ্রন্থে উপেক্ষিত ও বিস্মৃত লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের জীবন ও কর্ম তোলে ধরা হয়েছে। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের কংগ্রেস, স্বরাজ, কৃষক প্রজা পার্টির (সমিতি) অন্যতম সক্রিয় কর্মী ও নেতা। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনসহ স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে যতটুকু অবদান রেখেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সমাজসেবী, দক্ষ প্রশাসক, সংবাদপত্রের সম্পাদক, মুদ্রক ও প্রকাশক। তিনি লেখালেখিতেও যথেষ্ট সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ বইটি থেকে তাঁর সম্পর্কে পাঠক সার্বিক ধারণা পাবেন। মহাপ্রাণ ব্যক্তির জীবন ও কর্ম স্থানিক ইতিহাস রচনার জন্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থানিক ইতিহাসের উপাদান দেশের জাতীয় ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। জাতীয় ইতিহাস পৃথিবীতে স্মরণীয় হয়ে থাকে। বিস্মৃত মনীষা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের জীবন ও কর্মের ওপর এ বইটি নির্ভুল ও তথ্যশূন্যতা পূরণ এবং জেনর (Genre) বা ফর্ম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। গ্রন্থটির কিছু কিছু তথ্য সুধীজন ও পারিবারিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে আহরিত। এছাড়া কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাসের গেজেটিয়ারতুল্য বিভিন্ন গ্রন্থ ও লেখক, সাংবাদিক এবং নির্ভরযোগ্য প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ গ্রন্থে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের জীবনী তুলে ধরেছি। এ গ্রন্থে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার সম্পাদিত বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক 'তওফিক' পত্রিকায় প্রকাশিত সমকালের বেশ কিছু রচনা ও চিঠিপত্র সংযোজিত হয়েছে। এসব অগ্রন্থিত রচনা ও তথ্যের ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। জামালপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যে এসব দুষ্প্রাপ্য তথ্য মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী আমেনা প্রেস থেকে গোলাম মোহাম্মদের ‘বন্দিনী’ নামক উপন্যাস এবং জামালপুরের গণইতিবৃত্ত’সহ ঐ সময়কার এ অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিক অনেক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা এবং সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তানি দুঃশাসনের ষাটের বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ অঞ্চলের স্বাধিকার আন্দোলন-সংগ্রামের পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, আইয়ুব বিরোধী জারি ও গণসংগীতের পুস্তিকা তাঁর প্রেস থেকেই ছাপা হতো। তাঁর প্রেস ও পত্রিকা পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার রচিত দুটি গ্রন্থ- ‘আসামের জঙ্গলে’ (ভ্রমণ কাহিনি) ও উপন্যাস ‘মায়ার ভিটা’ কথা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর লেখা অপ্রকাশিত কবিতার পাণ্ডুলিপি ছিল। তিনি জামালপুর সাহিত্য সম্মেলন, ১৯৫৩ অনুষ্ঠানের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের কন্যা আঞ্জুমান আরা জামান (জন্ম. ১৯৪২-মৃত্যু. ২০১২) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রিধারী এবং জামালপুর থেকে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রিধারী মুসলিম নারী। বাংলাদেশের দন্তের পথিকৃৎ চিকিৎসক ফখরুজ্জামানের (মৃত্যু. ১৯৯৯) সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। আঞ্জুমান আরার লেখালেখির হাত ছিল এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার দুটি ছড়ার গ্রন্থ সোনামণিদের ছড়া (২০০৫), মনের মতো ছড়া (২০০৮) প্রকাশিত হয়েছিল। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের জ্যেষ্ঠপুত্র মির্জা আলী হায়দার (মৃত্যু : ২২.০৩.২০১৭) ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি এবং কনিষ্ঠপুত্র বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের অন্যতম জ্যেষ্ঠ বিচারক (অবসর গ্রহণ : ২৮.০২.২০২২) ছিলেন। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের পৌত্রী বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক সামাই হায়দার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন পরিব্রাজক। তিনি অর্থনীতিবিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রায় পঞ্চাশটির অধিক দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণবিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত লেখেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘টিলমাউন্ডস ট্রাভেল টেলস’ (২০২০) বিখ্যাত। বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা। জন্ম ১০ই জুন ১৯৮৫ সালে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার খাশিমারা গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আবদুর রহিম, মাতা মোসাম্মৎ মাজেদা খাতুন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা জামালপুরের মাহমুদপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে। পঞ্চম শ্রেণিতে সরকারি বৃত্তি (১৯৯৫) অর্জন। ঢাকা কলেজ থেকে ২০০৭ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর (২০০৮), সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএল.বি. (২০১৩)। একুশ শতকের শূন্য দশক থেকে লেখালেখি শুরু। মূলত তিনি সৃজনশীল প্রবন্ধ লিখেন। অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকা ও জার্নালে। কাজী নজরুল ইসলামের ওপর ও আইন-বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠক সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রথম ব্যাচে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। ‘অমর একুশে বাংলা একাডেমির ৬০ বছর ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ২০১৫ স্মারকপত্রে’র প্রকাশনা সহকারী এবং পাঁচ খণ্ডে সমাপ্য জেলা সাহিত্যমেলা ২০২২’ গ্রন্থের প্রকাশনা পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : জীবন-কথা : মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার’ (২০২২), ‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ (২০২৩), ‘ডা. মো. জাকির হোসেন : কালসমুদ্রে আলোরযাত্রী’ (২০২৪), মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার : জীবন ও কর্ম (২০২৫)। কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন কুমিল্লা সাহিত্য সংসদ গুণিজন সম্মাননা (২০২২), তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক পুরস্কার (২০০৯), ঢাকা কলেজ থেকে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক পুরস্কার (২০০৯), ঢাকা কলেজ থেকে ইদ-ই-মিলাদুন্নবি উপলক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক পুরস্কার (২০০৮)সহ বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা।