ছড়া শুধু শিশুতোষ বিনোদন নয়- ছড়া সমাজের দর্পণ, সময়ের দলিল এবং মানুষের অনুভবের সহজ ভাষা। ছন্দের আবরণে জীবনের গভীর সত্য, আনন্দ-বেদনা, আশা-হতাশা ও প্রতিবাদের কথা বলার শক্তিই ছড়ার মূল সৌন্দর্য। সেই শক্তিকে ধারণ করেই রচিত হয়েছে মো. আনছার আলীর একক ছড়াগ্রন্থ “নদীর নাম মাথাভাঙ্গা”।
এই গ্রন্থে ছড়াকার দেশপ্রেম, মানবিকতা, প্রকৃতি, বৈষম্য, ইতিহাস- ঐতিহ্য ও সমকালীন বাস্তবতাকে ছড়ার ছন্দে মেলে ধরেছেন অত্যন্ত সাবলীল ও আন্তরিক ভঙ্গিতে। এখানে যেমন আছে লাল-সবুজের পতাকার গৌরব, স্বাধীনতার অর্থ ও শহিদদের ত্যাগের কথা- তেমনি আছে মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ কষ্ট, শ্রমিকের অবহেলা ও মানবিক সংকটের নির্মম চিত্র।
ছোটদের জন্য যেমন এই ছড়াগুলো সহজ, ছন্দময় ও শিক্ষণীয়, তেমনি বড়দের জন্য এতে রয়েছে গভীর উপলব্ধি ও আত্মসমালোচনার আহ্বান। ভাষা সহজ, ভাব স্পষ্ট, অথচ বার্তা সুদূরপ্রসারী- এটাই এই গ্রন্থের প্রধান শক্তি।
এই বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি ও জনজীবনের গভীর সংযোগ। নদী, গ্রাম, ঋতুচক্র, গাছ, ফল, আলো, হারিকেন কিংবা চায়ের কাপ- সবই লেখকের ছড়ায় হয়ে উঠেছে জীবন্ত প্রতীক। বিশেষ করে ‘নদীর নাম মাথাভাঙ্গা’ ও ‘মাথাভাঙ্গার কষ্ট’ ছড়াদ্বয়ে একটি নদীর আত্মকথার মধ্য দিয়ে পরিবেশ ধ্বংস, দখলদারিত্ব ও মানুষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে নীরব আর্তি উচ্চারিত হয়েছে, যা পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে।
একই সঙ্গে এই গ্রন্থে আছে মায়ের আঁচলের নিরাপত্তা, বাবার নীরব ত্যাগ, শৈশবের বনভোজন, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতিকাতরতা এবং মানবজীবনের চিরন্তন বাস্তবতা। ‘শবে কদর’ কিংবা বিশিষ্ট সাহিত্যব্যক্তিত্ব বনওয়ারী লাল বাগলা দাদাকে স্মরণ করে লেখা ছড়াÑ গ্রন্থটিকে দিয়েছে ঐতিহ্য ও শ্রদ্ধার একটি আলাদা মাত্রা।
“নদীর নাম মাথাভাঙ্গা” কেবল একটি ছড়ার বই নয়; এটি সময়, সমাজ ও মানুষের প্রতি একজন সংবেদনশীল কবির দায়বদ্ধ উচ্চারণ। এই বই পাঠককে যেমন আনন্দ দেবে, তেমনি ভাবাবে, প্রশ্ন করতে শেখাবে এবং শিকড়ের কাছে ফিরে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করবে।